যুক্তরাজ্যের সাউথপোর্টে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ছুরি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র সহিংসতা ও দাঙ্গা। তিন কিশোরীর অকাল মৃত্যুকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এক মিথ্যা তথ্য পুরো যুক্তরাজ্যকে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেয়। তবে এই আগুনে ঘি ঢালার কাজটি সাধারণ কোনো ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নয়, বরং কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠী এবং এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মালিক ইলন মাস্কের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা করেছেন বলে তীব্র সমালোচনা উঠেছে।
ডিজিটাল দুনিয়ার ভুল তথ্য কীভাবে একটি দেশের বাস্তব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করাতে পারে, যুক্তরাজ্যের এই ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।
ঘটনার সূত্রপাত: সাউথপোর্টের ট্র্যাজেডি এবং মিথ্যার বিস্তার
যুক্তরাজ্যের সাউথপোর্টে শিশুদের একটি ড্যান্স পার্টিতে আকস্মিক ছুরি হামলায় তিন কিশোরী নিহত হয়। এই ঘটনার পরপরই ইন্টারনেটে একটি ভুয়া নাম ও পরিচয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কট্টর ডানপন্থী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, হামলাকারী একজন মুসলিম অভিবাসী, যে কি না অবৈধভাবে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসন দ্রুত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, হামলাকারী যুক্তরাজ্যেই জন্ম নেওয়া এক তরুণ এবং তার সাথে কোনো ধর্মীয় বা অভিবাসী সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু ততক্ষণে এই মিথ্যা তথ্য কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যার ফলে দেশজুড়ে তীব্র বর্ণবাদী ও অভিবাসী-বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়। কট্টর ডানপন্থীরা বিভিন্ন মসজিদ, আশ্রয়কেন্দ্র এবং পুলিশের ওপর চড়াও হয়।
ইলন মাস্কের বিতর্কিত ভূমিকা: 'গৃহযুদ্ধ অনিবার্য'
এই পুরো সহিংসতায় এক্স (X)-এর প্ল্যাটফর্ম মেকানিক্স এবং এর মালিক ইলন মাস্কের ভূমিকা সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইলন মাস্ক কেবল এই ভুল তথ্যের বিস্তার ঠেকাতে ব্যর্থ হননি, বরং নিজের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট থেকে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
- 'গৃহযুদ্ধ অনিবার্য' মন্তব্য: যুক্তরাজ্যের দাঙ্গার একটি ভিডিওর নিচে মন্তব্য করতে গিয়ে মাস্ক লেখেন, "যুক্তরাজ্যে গৃহযুদ্ধ এখন অনিবার্য।" একটি দেশের সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবেরের এমন মন্তব্যকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে আখ্যা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
- ভুয়া তথ্য শেয়ার: মাস্ক ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে কট্টর ডানপন্থী এক নেতার শেয়ার করা একটি ভুয়া খবরের স্ক্রিনশট রিটুইট করেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে দাঙ্গাকারীদের জন্য বিশেষ ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি সেটি মুছে ফেলেন।
- পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ: ব্রিটিশ পুলিশ যখন দাঙ্গাকারীদের কঠোর হস্তে দমন করার চেষ্টা করছিল, তখন মাস্ক অভিযোগ করেন যে ব্রিটিশ পুলিশ বর্ণবাদী আচরণ করছে এবং কেবল শ্বেতাঙ্গদের ওপর চড়াও হচ্ছে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে #TwoTierKeir হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রচারণাকে উসকে দেন।
কেন ইলন মাস্ক ও এক্স (X)-এর ওপর আঙুল উঠছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলন মাস্ক এক্স-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্রি-স্পিচ বা 'মুক্ত বাকস্বাধীনতার' নামে প্ল্যাটফর্মটির মডারেশন বা কনটেন্ট ফিল্টারিং ব্যবস্থা অনেকটাই শিথিল করে দিয়েছেন। এর ফলে অতীতে নিষিদ্ধ হওয়া অনেক কট্টর ডানপন্থী ও উগ্রবাদী নেতার অ্যাকাউন্ট পুনরায় সচল করা হয়।
সাউথপোর্টের ঘটনার পর এক্স-এর অ্যালগরিদম উসকানিমূলক এবং ভুয়া তথ্য সম্বলিত পোস্টগুলোকে দ্রুত লাখ লাখ মানুষের টাইমলাইনে পৌঁছে দেয়। মাস্ক নিজে সেই সব অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত থাকায় সেগুলোর রিচ (Reach) অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়, যা মাঠে থাকা দাঙ্গাকারীদের মানসিকভাবে আরও উৎসাহিত করে।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা
ইলন মাস্কের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের নতুন লেবার পার্টি সরকার। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আইন কেবল সড়কেই নয়, অনলাইনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। যারা অনলাইনে বসে সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগ ও প্রশাসন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি এবং নতুন আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো টেক জায়ান্ট কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।
শেষ কথা: ডিজিটাল মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা কোথায়?
যুক্তরাজ্যের এই দাঙ্গা প্রমাণ করে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন আর কেবল বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি ভূ-রাজনীতি ও একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্ট করার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। বাকস্বাধীনতার আড়ালে ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়ানোর এই প্রবণতা যদি এখনই লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে এমন আরও অনেক সাউথপোর্টের মতো ঘটনা দেখতে হতে পারে। আর ইলন মাস্কের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বুঝতে হবে যে, কোটি কোটি মানুষের ওপর প্রভাব খাটানোর ক্ষমতার সাথে সমানুপাতিক দায়িত্ববোধও থাকা জরুরি।
